বাংলার স্বর্গ : বান্দরবান-১ ( বগালেক, কেওক্রাডং)

ছোট ছোট অনেক গুলা ট্যুর এর মাধ্যমে দেশ ভ্রমন শুরু। এইবার এর টা বান্দরবান। আমরা ৪ জন। প্রথম প্ল্যান ছিল নাফাখুম থেকে সামনের দিকে যতটুকু পারি যাব। প্লান অনুযায়ী আমরা সকালে উঠে নতুন ব্রিজ পৌছায়। নতুন ব্রিজ থেকে বান্দরবান হয়ে থানচির গাড়িতে। গাড়ি চলে যাচ্ছে তার নিজের গতিতে,কখনো উঁচুু পথে কখনো নিচু পথে । চিম্বুক পূর্যন্ত গিয়ে হঠাৎ প্ল্যান পরিবর্তন। নতুন প্ল্যান করলাম  বগালেক, কেওক্রাডং। দেশের সবচেয়ে বড় পর্বত গুলার মধ্যে একটা। তাই এক্সাইটমেন্ট বেড়েছিল। যেতে হবে রুমা বাজার হয়ে। চিম্বুক থেকে রুমা যাওয়ার জন্য গাড়ি পাচ্ছি না। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর গাড়ি চোখে পড়ল । সচারচর গাড়িতে ওরা না উঠালেও ভদ্রভাবে বলায় উনারা ওয়াই জংশন পর্যন্ত নামানোর ব্যাবস্থা করে দিলেন। পুরা গাড়ির পিছনে আমরা ৪ জন। দুইপাশে সবুজ পাহাড় আর মাঝখানে সেনাবাহিনীর গাড়ি ছুটে চলছে। অন্যরকম অনুভূতি, ৪০ মিনিট এর মত ছিলাম। যেন পাহাড়ে ভাসতেছি, ওয়াই জংশন এ নেমে চলে গেলাম সোজা রুমা শহরে। সেখানে আরেক অনুভূতি। বাসের চাঁদের উপরে ৪ জন আমরা। মনে হচ্ছিল পাহাড়ের মাঝখানে পাখির মত উড়ে চলেছি আমরা।

রুমাতে যাওয়ার পথে বাসের চাঁদেই  ট্যুর গাইড সাদেক ভাইকে পেয়ে যাই। আমাদের ভাগ্য আসলে পথে পথে ভাল বলা যাই, সাদেক ভাইকে পাওয়াই আমরা প্লানের অতিরিক্ত রিজুক ঝর্ণার দেখা পাই। যাক, রুমা শহরে নেমে প্ল্যানমত আদনানের স্কুল বন্ধুর সাথে দেখা।  বন্ধুরে নিয়ে পরে বলব । বন্ধু সহ ৫, জন গেলাম বান্দরবান এর আরেকটা সুন্দর ঝর্ণা রিজুক ঝর্ণা দেখতে।
সাংগু নদী দিয়ে নৌকা নিয়ে রিজুক ঝর্ণা দেখতে যাওয়া পুরা ট্যুর এর একটা হাই ভোল্টেজ বোনাস ছিল। যাক, সবাই মিলে রিজুক এ গোসল, ঝর্ণার সেরা ফিলিংস নেওয়া কমপ্লিট। এইবার বন্ধুর কটেজ এ যাওয়া। অথিতি আপ্পায়ন, কটেজ সব কিছু নিয়ে, রাতের খাবার, রাতের আড্ডা, হালকা বৃষ্টিতে কটেজের বারান্দায় বসে বসে পাহাড় দেখা, পাহাড়ের চুড়ায় কটেজ এ বসে পাহাড় দেখা ।
এই ট্যুরে আদনান ৩টা সানগ্লাস হারিয়েছে, এটা নিয়ে রাতে আদনানের সাথে সেই ঝগড়া😛

সকালে উঠেই মিশন বগা লেক এবং কেওক্রাডং। চাঁদের গাড়িতে করে বগালেক পৌছাই । যাওয়ার পথ এক কথায় অসাধারন। পাহাড়ী পথের সৌন্দর্য পুরো ব্লগে বর্ণনা হবে তাই আলাদা করে বর্ণনা করছি না । লেকটির সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ সবাই। লেকটিতে গিয়ে দেখা মিলবে স্বচ্ছ পানি সমৃদ্ধ মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, দূর থেকে সবুজ রঙে ঘেরা অন্যরকম সুন্দর এক লেক!সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৭০০ ফুট উঁচু পাহাড়ে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট বগা লেক। ভূ-তত্ত্ববিদগণের মতে প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রাকৃতিক ভাবে পাহাড়ের চূড়ায় এই লেক তৈরি হয়। মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ কিংবা মহাশূন্য থেকে উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। ক্রেওক্রাডং এর কোল ঘেঁষে বান্দারবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের উপরে প্রায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে এই লেকের অবস্থান। শান্ত জলের এই লেক আকাশের কাছ থেকে একমুঠো নীল নিয়ে নিজেও ধারন করেছে সে বর্নিল রং। প্রকৃতি এখানে ঢেলে দিয়েছে একরাশ সবুজের ছোঁয়া। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আসার ক্লান্তি হারিয়ে যায় হ্রদের পাহাড় ঘেরা সৌন্দর্যে। সবকিছু মিলে এ যেন এক সুন্দরের লীলাভূমি।

এরপর নাস্তা করে দেরি না করে যাত্রা শুরু কেওক্রাডং এর উদ্দ্যেশ্যে। অনেক জনের অনেক কথা। কেউ বলে ৫ ঘন্টা, কেউ বলে ৪ ঘন্টা হাটা লাগবে । কেওক্রাডং – বেশি নাহ, ভূপৃষ্ঠ থেকে  ৩২৭৫ ফুট উপরে। এর চূড়ায় যেতে হলে  আপনাকে হাটতে হবে এই ৩২৭৫ ফুট উপরের দিকে। তাও আবার রাস্তার যা অবস্থা। আঁকাবাকা । এই ধরনের ট্রেকিং করতে কিছুটা ধ্যর্য আপনার থাকা চাই ।যেতে যেতে পাহাড়ের উপত্যকার সৌন্দর্য শুধুই উপভোগের।  সবুজ যেন কবির হাতে আকানো এক অপরুপ দৃশ্য । 😍

সামনের দিকে আগানো যাক, যেতে হবে কেওক্রাডং এর চূড়ায়। মিশতে হবে কেওক্রাডং এর মেঘের সাথে। এই ট্র‍্যাকে দেখার মত আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো পাহাড়ি উপজাতিদের পাড়া গুলো। কিছুদূর পরপর আপনাকে স্বাগত জানাবে এক-একটি পাড়া। দুইপাশে বড় বড় পাহাড় আর মাঝখানে ৮/১০টা ঘর সাথে মেঘ তো আছেই। হালকা উপর থেকেও এই দৃশ্য দেখে আপনার চোখ কিছু সমঢের জন্য যাস্ট দাঁড়িয়ে থাকবে। সুন্দর, সযত্নে তৈরি এই পাড়া গুলো। ৩/৪ টা পাড়ার মধ্যে একটা পাড়া দার্জিলিং পাড়া। দার্জিলিং পাড়াই আপনি নিয়মিত মেঘের সাথে আলিঙ্গন করবেন। হালকা নাস্তা করলাম দার্জিলিং পাড়ায়। নাস্তা সেরে আবার শুরু যাওয়ার পথে শেষ হাটা। পরের ২৫ মিনিট হাটাতেই পৌছালাম কেওক্রাডং এর চূড়ায়।

দীর্ঘ ৪-৫ ঘন্টার মত হাটালাম, উঠলাম, চড়লাম। পায়ের অবস্থা আর নাই বলি। দিনশেষে অবশেষে পৌছালাম। আমরা যখন কেওক্রাডং পৌছালাম তখন হালকা সময়টা বিকাল বেলা। হাল্কা বৃষ্টি আর প্রচন্ড মেঘ। তেমন কিছু দেখাই যায় নাহ। ১০-১৫ মিটার দূরে গেলে আমরা একজন আরেকজন কে দেখতেছি নাহ। এই ফিলিংস অন্য রকম।
কেওক্রাডং এর চূড়ায় থাকার ব্যাবস্থা করেন, এই পর্বত বা এরিয়ার মালিক (লালা) নামে একজন। কয়েকটা কটেজ ভাড়া দেন, খাওয়ার ব্যাবস্থা ও করেন উনি। খাওয়ার এর মান অবশ্যয় ভাল।পুরো দিনের ম্যাক্সিমাম সময় মেঘের মধ্যে ডাকা। রাতে তো মারাত্মক অবস্থা। মেঘ, ঠান্ডা বাতাস, হাল্কা বৃষ্টি এই যেন মেঘে এর রাজধানী ।

সকলে ঘুম তো ভাঙে নাহ । এত আরামের আবহাওয়া ফেলে ঘুমহীন ব্যাক্তির ও ঘুম ভাঙা অস্বাভাবিক। সময় স্বল্পতায় ঘুম থেকে উঠতে বাধ্য।সকাল বেলার হাল্কা বৃষ্টি, মেঘ এ আচ্ছন্ন পরিবেশ এর মধ্যেও উঠলাম হেলিপ্যাড এ। ও হ্যালিপ্যাড হচ্ছে পাহাড়ের একদম চুড়া। যেখান হেলকপ্টার ল্যান্ড করে সেনাবাহিনিরা। হেলিপ্যাড থেকে দাড়িয়ে নিজেকে সবুজ রাজ্যের কিং মনে হচ্ছে।

সকাল ১০টার বেশি তখন। ব্যাক করা লাগবে। তবে কয়েকটা জিনিস মিস করসি সময় স্বল্পতার কারণে। লাইফে যদি আরেকবার যাওয়া হয় ইনশাআল্লাহ মিস হবে নাহ। তবে ৩২৭৫ ফুট উপরে এসে দুইপাশে পাহাড় আর সাথে মেঘ নিয়ে আপনার কোন আত্মতৃপ্তি থাকবে নাহ। তাই ফিরে আসতে কষ্ট নাই। সেই আগের পথে হাটতে হাটতে চলে আসলাম বগালেক এ। বগালেক এর গোসল করে ব্যাক টু রুমা শহর। রুমা শহর থেকে সোজা বান্দরবান হয়ে চট্টগ্রাম ।

লিখাতে সাহায্য করেছেন বন্ধু আদনান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *